প্যারিসের শান্তিসম্মেলনে (Paris peace Conference 1999)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ(28 July, 1914 - 11 November,1919)শেষ হয় জার্মান ও মিত্রশক্তির যুদ্ধবিরাম চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরের মাধ্যমে। এর পর বিজিত মিত্রপক্ষ পরাজিত দেশগুলির সাথে স্থায়ী চুক্তি করে নেওয়ার উদ্দেশে প্যারিসে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ ছিল- (i) জাতীয়তার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির সীমানা নির্ধারণ করা, (ii) পরাজিত দেশগুলি থেকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায় করা, এবং (iii) স্থায়ী শান্তি স্থাপন করা।
18 January, 1919 সালে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। প্যারিসের শান্তিসম্মেলনে রাশিয়া ও পরাজিত দেশ জার্মানি, অস্ট্রিয়া, তুরস্ক, বুলগেরিয়া বাদে মোট 32 টি দেশকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের 70 জন প্রতিনিধি এই শান্তি সম্মেলনে সামিল হয়েছিল। এছাড়ও বহু সাধারণ লোক, সেনাধিনায়ক ও বহু নেতা এখানে এসেছিলেন। উপস্থিত সব দেশের প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ মত রাখেন। এর মাধ্যমে আমেরিকার প্রধানমন্ত্রী উড্রো উইলসনের 14 দফা নীতি ও লীগ অফ নেশন-এর প্রস্তাব উঠে আসে।
তাছাড়া প্রতিটি পরাজিত দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা নানান সন্ধি স্বাক্ষর করা হয়।
1. জার্মানির সাথে ভার্সাই সন্ধি;
2. অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সেন্ট জার্মান সন্ধি;
3. বুলগেরিয়ার সঙ্গে ন্যুইলী সন্ধি;
4. হাঙ্গেরির সাথে ট্রিয়েনো সন্ধি;
5. তুরস্কের সাথে সেব্রের সন্ধি।
প্যারিসের শান্তিসম্মেলনের মাধ্যমে মিত্ররাষ্ট্ররা চেয়েছিল বিশ্বে স্থায়ীভাবে শান্তি ফিরিয়া আনতে। যাতে এমন ভিবিশিকামুলম যুদ্ধ পৃথিবীর বুকে আর না হয়।
● বিশ্বশান্তি বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রসংঘের প্রতিষ্ঠা করা হয়।
● ফ্রান্সের সুরক্ষার জন্য রাইন নদীর পশ্চমতীরের অঞ্চলকে জার্মানির থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়।
● জার্মানির জয় করা রাজ্যগুলো তাদের ফিরিয়া দিতে হয়। সেই রাজ্যগুলির জাতীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
● এশিয়া ও আফ্রিকার জার্মান উপনিবেষগুলি মিত্ররাষ্ট্ররা কব্জা করে নেয়।
● জার্মানি যাতে পুনরায় যুদ্ধ না করতে পারে এর জন্য জার্মানির সৈন্য কম করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
● যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও জার্মানির থেকে আদায়ের কথা বলা হয়।
প্রায় 4 মাস ধরে আলোচনার মাধ্যমে এইসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। এর পর 6 May, 1919-এ চূড়ান্ত চুক্তিপত্রটি রূপায়িতক হয় এবং পরদিন তা জার্মানির প্রতিনিধির কাছে পেরণ করা হয়।
ভার্সাই সন্ধি (Treaty of Versailles)
প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে যতগুলি সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তাদের মধ্যে সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভার্সাই সন্ধি। জার্মানির প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে এই চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়। 230 পাতায় বিশ্লেষিত এই সন্ধি 15 টি ভাগে বিভাজিত ছিল। এতে মোট 439 টি ধারা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সম্পূর্ন দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে May 2019-এ জার্মানির প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সাথে হুমকি দেওয়া হয়, জার্মান যদি এতে স্বাক্ষর না করে তাহলে তাকে পুনরায় যুদ্ধে নামতে হবে। শেষে 28 June, 1919-এ পরাজিত জার্মানি এই অপমানজনক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।
ভার্সাই চুক্তির দ্বারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানির ওপর বহু বাধানিষেধ ও ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়া দেওয়া হয়। এরকম তিনটি মাধ্যমে ওপর জার্মানির ওপর মামলা চালানো হয়। যথা-(i) প্রাদেশিক মামলা; (ii) সামরিক বিধিনিষেধ এবং (iii) আর্থিক ক্ষতিপূরণ।
(i) প্রাদেশিক মামলা:-
ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জার্মানির বিজিত রাজ্যগুলি সহ বিস্তির্ণ ভূখন্ডকে জার্মানির থেকে আলাদা করা হয়।
● আলসাস লরেন্স অঞ্চলটি ফ্রান্সকে দিতে হয়।
● নবনির্মিত বেলজিয়াম, পলেন্ড ও চেকোস্লোবাকিয়াকে স্বাতন্ত্র ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মান্যতা দিতে হয়।
● জার্মানির উপনিবেষগুলির সব অধিকার মিত্ররাষ্ট্রদের হাতে তুলেদিতে বাধ্য করা হয়।
● রাইন নদীর উভয়তীরে 50 মিটার পর্যন্ত নিরস্ত্রীকরণ করা হয়।
● জার্মানির ডেজিং বন্দর রাষ্ট্রসংঘের সংরক্ষণে ছেড়েদিতে হয়।
● জার্মানির মেমল বন্দর লিথুয়ানিয়াকে দিতে হয়।
● রাইন প্রদেশে মিত্রপক্ষের সেনা মোতায়েন করা হয়।
● জার্মানির শাসনব্যাবস্থা রাষ্ট্রসংঘের এক আয়োগের অধীনে চালাতে হয়।
● সারঘাটি দোহান ফ্রান্সকে, উত্তর শ্লেসেবিগ ডেনমার্ককে, মালমেরি ইউপ্রেন ও মার্সনেট বেলজিয়ামকে দেওয়া হয়।
● জার্মানি রাশিয়া থেকে যে বৃহৎ অংশটি জিতে নিয়েছিল সেই স্থানে লাথিয়া, এস্টোবিয়া ও লিথুয়ানিয়া দেশ স্থাপন করা হয়।
(ii) সামরিক বিধিনিষেধ:-
ভার্সাই সন্ধি দ্বারা জার্মানির সেনাবাহিনীর সীমাবদ্ধতা স্থির করা হয়।
●বলা হয় 12 বছরের মধ্যে জার্মানির স্থল সেনা 1 লক্ষের বেশি বাড়াতে পারবে না।
● জার্মানির যুদ্ধসামগ্রী নির্মাণ ও আমদানিতে বন্ধ করা হয়।
● জার্মান নৌসেনায় 15 হাজারের বেশি সৈনিক রাখতে পারবে না।
● কীল নেহেরকে অন্তররাসট্রিয় ঘোষণা করা হয়।
● জার্মান বায়ুসেনার বিলুপ্তিসাধান করা হয়।
● রাইন অঞ্চলকে অসৈন্যকারণ করা হয়।
(iii) আর্থিক ক্ষতিপূরণ:-
ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানিকে আর্থিক দিকথেকে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। সন্ধিতে বলা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য একমাত্র দায়ী জার্মানি, তাই এর ক্ষতিপূরণও জার্মানিকেই বহন করতে হবে।
● যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে 500 কোটি ডলার মিত্ররাষ্ট্রকে দেওয়ার বোঝা চাপানক হয় জার্মানির ওপর।
● জার্মানির উপনিবেষগুলিতে বিনিয়োগ করা সমস্ত অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়।
● ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়ামকে নির্দিষ্ট মাত্রায় কয়লা সর্বরাহ করার দায়িত্ব চাপানো হয় জার্মানির ওপর।
● জার্মানির 1600 টন বা তার বেশি ওজনের সব জাহাজ মিত্ররাষ্ট্রকে দিয়েদিতে হয়।
![]() |
the contemporary view of German reparations, after the treaty of Versailles |
এসব ছাড়াও জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়ামের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর কথা বলা হয় এই ভার্সাই চুক্তির মধ্যে। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি। জার্মানির গুরুত্বপূর্ন নদীগুলোকে অন্তররাসট্রিয় ঘোষণা করা হয়। ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানিকে রাজনীতিক, আর্থিক ও সামরিক দিকথেকে পঙ্গু করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এরফলে জার্মানির মোট ক্ষেত্রফলের 8 ভাগ জমি ও 70 লক্ষ জনসংখ্যা কমে যায়। এই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির সমস্ত উপনিবেশ, 15% কৃষিভূমি, 15% গবাদি ও 10% কারখানা কেরে নেওয়া হয়।
ভার্সাই সন্ধি জার্মানির ওপর জোড়যবস্থি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই হিটলার ও জার্মানির জনগণ এই সন্ধিকে ঘোর অপমানজনক মনে করে। একারণেই এই সন্ধি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
PDF in Bengali
|
Click Here
|
PDF in
English
|
|
Watch Video Solutions
|
1 মন্তব্যসমূহ
খুব ভালো
উত্তরমুছুন